শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

নাজাত লাভের উপায়

মনসুর আহমদ : মুসলিম সমাজে আজ র্শিক তৌহিদী আকিদা ও জাতি বিধ্বংসী ব্যাধি রূপে চেপে বসেছে অসাবধানী মুসলমানদের অজান্তে। মানুষের মন-মস্তিষ্কে ও সমাজমূলে যখন এই শরীকবাদ বা বহুখোদাবাদ গেড়ে বসে, তখন সেখান থেকে আল্লাহর অনুশাসন বদলে যেতে থাকে, আর সে স্থান ধীরে ধীরে দখল করে নেয় জাহেলিয়াত। শিরক সব চাইতে বড় জুলুম। “ইন্নাশ শিরকা লাজুলমুন আজীম।”
তৌহিদবাদী মুমিনের মোকাবিলায় রয়েছে বহুখোদাবাদী দল, যাদেরকে শরীয়তের পরিভাষায় মুশরিক বলা হয়ে থাকে। তাদের পরিণাম সম্পর্কে ঘোষণা হয়েছে, “যে আল্লাহর সাথে শিরক করে সে যেন আসমান থেকে পড়ে গেছে। অত:পর তাকে পাখি ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে অথবা বাতাস তাকে নিক্ষেপ করবে অনেক দূরবর্তী স্থানে। (হজ্জ)”
র্শিক থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহ এবং আল্লাহর রসুলের পক্ষ থেকে নির্দেশ এসেছে :
১) তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। আর তার সাথে কাউকে শরীক করো না। (নিসা-৩৬)
২) হে মুহম্মদ বলো, [হে আহলে কিতাব] তোমরা এস তোমাদের রব তোমাদের জন্য যা হারাম করে দিয়েছেন তা পড়ে শুনাই। আর তা হচ্ছে এই, “তোমরা তার সাথে কাউকে শরীক করবে না।” (আনআ’ম-à§§à§«à§§)
হাদিস - হজরত ইবনে মাসউদ (রা:) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মুহম্মদ (স:)-এর মোহরাঙ্কিত অসিয়ত দেখতে চায়, সে যেন আল্লাহ তাআ’লার এ বাণী পড়ে নেয়, “হে মুহম্মদ বলো, তোমাদের রব তোমাদের উপর যা হারাম করেছেন তা পড়ে শুনাই। আর তা হলো, তোমরা তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না, আর এটাই হচ্ছে আমার সোজা পথ।”
র্শিক কি? 
র্শিক মানে শরীক করা বা অংশবাদিত্ব বা বহুত্ববাদ। বহুত্ববাদ হল স্রষ্টা, প্রতিপালক ও সর্বশক্তিমান, সর্বনিয়ন্তা আল্লাহর অংশীদার স্থির করা, কিংবা আল্লাহ ছাড়া কাউকে আল্লাহর বিশেষণে বিশেষিত করা; আর এ কথায় বিশ্বাস করা যে, ক্ষমতা, রহমত বা ইষ্ট অনিষ্ট আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে আসা। শরীয়তের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘র্শিক’।
শিরকের তিনটি স্তর রয়েছে। যথা-
১. শিরকে আকবর বা বড় শিরক।
২. শিরকে আসগর বা ছোট বা সাধারণ শিরক
à§©. ‘শিরকুল খফী’ বা অস্পষ্ট শিরক।
শ্রিক আকবার বা ঘোর বহুত্ববাদ -এর বিধাকে চার ভাগে ভাগ করা যায়।
à§§. আশ র্শিকুদ্ দুআ’- যে শিরকে আল্লাহ ছাড়া অন্য দেবদেবীকে ডাকা বা অন্য দেবদেবীর কাছে প্রার্থনা করা।
২. ‘আশ র্শিকুন্ নিয়াহ ওয়াল ইরাদা ওয়াল কাস্দ্’ -আল্লাহ ছাড়া অন্যের প্রতি উপাসনা বা প্রার্থনায় কিংবা ধর্মীয় আচারে নিয়ত বা সংকল্প করা এবং তাকে ছাড়া অন্যকে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য স্থির করা।
à§©. আশ্শিরকুত্ তাআ’-আল্লাহর হুকুম বা বিধানের বিরুদ্ধে অন্য কোন শক্তির আনুগত্য করা।
৪. আশ্ শিরকুল মুহব্বা - যে প্রেম বা ভক্তি একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য তা তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে নিবেদন করা হলো মহা শিরকের চতুর্থ প্রকার।
র্শিকুল আসগর-
প্রশংসা, যশ বা পার্থিব লাভের আশায় কোন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান করা বা ইবাদত করা হলে যে র্শিক অভিব্যক্তি হয়, তাকে ছোট শিরক বা ‘র্শিকুল আসগর’ বলা হয়। লোক দেখানো ইবাদত বা রিয়া এ পর্যায়ের র্শিক। এ শিরকের ভয়াবহতা সম্পর্কে দু’খানা হাদিস-
ওমর ইবনে খাত্তাব (রা:) বর্ণনা করেন -“তিনি একদিন নবী (স:)-এর মসজিদে উপস্থিত হলে সেখানে তিনি দেখেন যে, মু’আয বিন জাবাল (রা:) নবী (স:)-এর কবরের নিকট কাঁদছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন- ‘কেন কাঁদছ?’ মু’আয বিন জাবাল (রা:) বলেন ‘আমি রসুলুল্লাহ (স:)-এর কাছে থেকে একটা কথা শুনেছিলাম, ঐ কথাই আমাকে কাঁদাচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, ‘সামান্যতম রিয়া হল শিরক’।’ (মিশকাত)
র্শিকুল খফী বা গুপ্ত র্শিক-
হজরত আবু সাঈদ (রা:) থেকে এক মরফু হাদিসে বর্ণিত আছে, “আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয় সংবাদ দেব না? যে বিষয়টি আমার কাছে ‘মসীহ দাজ্জালের’ চেয়েও ভয়ঙ্কর?” সাহাবায়ে কেরাম বলেলেন,হাঁ। তিনি বললেন, তা হচ্ছে শিরকে খফী বা গুপ্ত শিরক। [আর এর উদাহরণ হচ্ছে] একজন মানুষ দাঁড়িয়ে শুধু এজন্যই তার নামাজকে খুব সুন্দর ভাবে আদায় করে যে, কোন মানুষ তার নামাজ দেখছে [বলে সে মনে করছে]।” (আহমদ)          
 à¦°à§à¦¶à¦¿à¦•মুক্ত জীবনই নাজাতের এক মাত্র পথ-
আল্লাহতাআ’লা ইরশাদ করেন, “যারা ঈমান এনেছে এবং ঈমানকে জুলুম [শিরক]এর সাথে মিশ্রিত করেনি ” [তাদের জন্যই রয়েছে নিরাপত্তা] আনআ’ম : ৮২)
হজরত আনাস (রা:) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, “আমি রসুলুল্লাহ (স:)কে বলতে শুনেছি : “আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন, “হে আদম সন্তান, তুমি দুনিয়া ভর্তি গুণাহ নিয়ে যদি আমার কাছে হাজির হও, আর আমার সাথে কাউকে শরীক না করা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করো,তা হলে আমি দুনিয়া পরিমাণ মাগফিরাত নিয়ে তোমার দিকে এগিয়ে আসব। (তিরমিজি)
বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে: -“আর যারা তাদের রবের সাথে শিরক করে না। ” (মুমিনুন-৫৯)আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করা গুণাহ মাফ করবেন না। শিরক ছাড়া অন্যান্য যেসব গুণাহ রয়েছে সেগুলো যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেবেন। (নিসা - ৪৮)।
হজরত জাবের (রা:) থেকে বর্ণিত আছে,রসুল (স:) ইরশাদ করেন, “যেব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যু বরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে মৃত্যু বরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (মুসলিম) ইবনে মাসউদ (রা:) থেকে বর্ণিত আছে রসুল (স:)ইরশাদ করেন,“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (বোখারী)
শিরকের জাহেলিয়াতের পরিণতিতে পৃথিবীতে নেমে আসে ধ্বংস লীলা। সাধারণ মুসলমানতো দূরে থাক অনেক জ্ঞানী লোকেরাও শিরক কি ভাবে সমাজকে ধ্বংস করে চলছে সে সম্পর্কে গাফিল।
‘শিরক’ ও ‘শুরাকা’ শব্দদ্বয় পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে এসেছে। আমরা সাধারণত এই শব্দদ্বয়কে দেব-দেবী, মূর্তি বা এই ধরনের অলৌকিক শক্তির অধিকারীকে আল্লাহর সাথে উপাসনা করা অর্থে ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু মুমিনগণও যে বিভিন্ন সময় মানুষকে আল্লাহর অংশীদার রূপে মেনে থাকি তা আদৌ খেয়াল করি না বা বুঝিও না। ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে কোরআনের দিকে তাকালে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
“এমন ভাবে তাদের শরীকেরা বহু সংখ্যক মুশরিকদের জন্য তাদের নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করার কাজকে খুবই আকর্ষণীয় বানিয়ে দিয়েছে। যেন তারা তাদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিমজ্জিত করে এবং তাদের কাছে তাদের দ্বীনকে সন্দেহপূর্ণ বানিয়ে দেয়। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তারা এরূপ করত না। কাজেই তাদেরকে ছেড়ে দাও। তারা নিজেদের মিথ্যা রচনায় লিপ্ত থাকুক। (আনয়াম- à§§à§©à§­)”
এ আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিখ্যাত তাফসীর তাফহীমুল কোরআনে লেখা হয়েছে, “এ আয়াতে শরীক বলতে বুঝানো হয়েছে সে সব মানুষ ও শয়তানকে যারা সন্তান হত্যার মত জঘন্য কাজকে লোকদের দৃষ্টিতে সংগত ও আকর্ষণীয় ব্যাপার বানিয়ে দিয়েছিল। এদেরকে কোরআনে শরীক বলার কারণ এই যে, ইসলামের দৃষ্টিতে পূজা, উপাসনা ও আরাধনা পাওয়ার একমাত্র অধিকারি আল্লাহ, অনুরূপ ভাবে জনগণের জন্য আইন বিধান প্রণয়ন এবং জায়েজ না জায়েজের সীমা নির্ধারণের অধিকারি একমাত্র আল্লাহ। অতএব, পূজা, উপাসানা, আরাধনা কোন একটি কাজ খোদা ছাড়া অন্য কারও জন্য করা হলে তাতে যেমন খোদার সাথে শরীক করা হয়, ঠিক অনুরূপ ভাবে খোদা ছাড়া অন্য কারো মনগড়া আইনকে ঠিক ও নির্ভুল মনে করে তা পালন ও কার্যকর করলে এবং কারো নির্ধারিত সীমাকে অবশ্য লালন পালন যোগ্য মেনে নিলেও খোদার সাথে শরীক করার সমান অপরাধ হয়। এই দুই ধরনের কাজ নিশ্চয়ই শিরকের কাজ। যারা এই শিরক করে তারা যাদের সামনে পূজা উপাসনার দ্রব্য সামগ্রী পেশ করে কিংবা যাদের রীতি আইন বিধানকে অবশ্য মাননীয় বলে বিশ্বাস করে ও মানে তাদেরকে মুখে ইলাহ, রব বা আল্লাহ না বললেও তাতে কিছু আসে যায় না।”
এ কথা সুস্পষ্ট ভাবে উপলব্ধি করার জন্য এই সূরারই নিচের অংশ টুকুর দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। এরশাদ হচ্ছে-“হে মুহাম্মদ, এই লোকদেরকে বল যে, তোমরা এস আমি তোমাদেরকে শুনাব তোমাদের রব তোমাদের উপর কি বিধি নিষেধ আরোপ করেছেন, তার সাথে কাউকেও শরীক মনে করবে না, তার অধিকারের ক্ষেত্রেও নয়”।
এ অংশের ব্যাখ্যায় তাফহীমুল কোরআনে লেখা হয়েছে “খোদার মূল সত্তায় কাকেও তাঁর শরীক মনে করবে না। না তাঁর গুণাবলীর ক্ষেত্রে। তাঁর ক্ষমতা এখতিয়ারের ব্যাপারে অনুরূপ ভাবে কাকেও তাঁর শরীক মনে করবে না, তাঁর অধিকারের ক্ষেত্রেও নয়।”
সাধারণত খোদার মূল সত্তায় শিরককেই আমাদের সমাজে শিরক মনে করা হয়। কিন্তু ব্যাপারটি তা নয়। খোদার মূল সত্তায় শিরক হয় মূল খোদায়ীর ব্যাপারে কাকেও অংশীদার মানলে। যেমন- খ্রিষ্টানদের তিন খোদার আকিদাহ। আরব জাহেলিয়াতের মুশরিকরা যেমন ফেরেশতাদের খোদার কন্যা মনে করত এবং অপরাপর মুশরিকরা যেমন নিজেদের দেব দেবী ও নিজেদের জাত বংশকে খোদার জাত বলে শ্বিাস করত। এই সব আকিদাহ খোদার মূল সত্তায় শিরক এর পর্যায় গণ্য। আল্লাহর মূল সত্তায় শিরক থেকে আমরা অনেকে দূরে অবস্থান করতে পারলেও তাঁর গুণাবলী, ক্ষমতা ও অধিকারেরর ক্ষেত্রে যে শিরক করে চলেছি তা দূষণীয় মনে করি না।
গুণাবলীর ক্ষেত্রে খোদার সাথে শিরক হয় যদি খোদার বিশেষ গুণাবলীকে যেমন ভাবে তা খোদার জন্য নির্দিষ্ট তেমন ভাবেই সেগুলিকে বা তন্মধ্যে কোন একটিকে অপর কারো মাঝে পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করা হলে। যেমন কারো সম্পর্কে বিশ্বাস করা যে গায়েবি জগতের সকল তত্ত্ব ও তথ্য তার নিকট সুস্পষ্ট কিংবা সে সব কিছু জানে, সব কিছু শোনে অথবা যদি ধারণা করা হয় যে, সে সব ধরনের দুর্বলতা অক্ষমতা ও সকল ধরনের দোষ ত্রটি হতে মুক্ত ও পবিত্র।
ক্ষমতা ইখতিয়ারের ক্ষেত্রে খোদার সাথে শিরক হয় যদি খোদা হিসেবে খোদার জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট ক্ষমতা ইখতিয়ারগুলো কিংবা তন্মধ্যে বিশেষ কোনটি খোদা ছাড়া অপর কারো আছে বলে মেনে নেয়া হয়। যেমন- অতি প্রাকৃতিক উপায়ে উপকার বা ক্ষতি পৌঁছাবার ক্ষমতা, প্রয়োজন পূরণ করা ও সাহায্য সহায়তা করার সামর্থ, রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখা শোনা করার শক্তি, দোয়া প্রার্থনা শোনা, ভাগ্য তৈরী ও নষ্ট করার ক্ষমতা থাকা। একই ভাবে হালাল হারাম জায়েজ নাজায়েজের সীমা নির্ধারণ করা ও মানব জীবনের জন্য আইন বিধান রচনা করা। বস্তুত এ গুলো সবই খোদার খোদায়ীর বিশেষ গুণাবলী। এর কোন একটি আল্লাহ ছাড়া অপর কারো আছে বলে মেনে নেয়াই হচ্ছে ইখতিয়ারের ব্যাপারে শিরক।
আল্লাহর অধিকারের ক্ষেত্রে শিরক হয় যদি খোদা হিসাবে বান্দাহদের উপর তাঁর যে বিশেষ অধিকার রয়েছে তা, বা তন্মধ্যে কোন একটি অধিকারকে খোদা ছাড়া অপর কারো জন্য মেনে নেয়া হয়। যেমন- রুকু- সিজদা, হাত জোড় করে বিনীত ভাবে সামনে দাঁড়ানো, কারো আস্তানায় চুমু দেওয়া, নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা কিংবা শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতির জন্য কারো নামে মানত বা নিয়াজ মানা, বলি দান করা, প্রয়োজন পূরণ ও বিপদ মুক্তির আশায় মানত মানা, পবিত্রতা বর্ণনা করার অন্যান্য যত রকম ধরন ও পদ্ধতি খোদার জন্য নির্দিষ্ট তা খোদা ছাড়া অপর কারো জন্য মনে করা। এমনই ভাবে কাকেও এতদূর প্রিয় বানানো যে তার প্রেম ভালবাসায় অপরাপর সব প্রকার প্রেম ভালোবাসাকে কোরবানি দেয়া, কাকেও ভয় ভীতি আতংক পাওয়ার এতদূর অধিকারি মনে করা যে উপস্থিত অনুপস্থিত সকল অবস্থায় তার নারাজি অসন্তোষ ও তার হুকুমের বিরোধিতা করাকে ভয় করা হবে। বস্তুত এরূপ ভয় কেবল মাত্র খোদাকেই করা যেতে পারে। মানুষের জন্য এরূপ ভয় পাওয়া কেবল খোদার জন্যই শোভা পায়।
শর্তহীন আনুগত্য কেবল খোদারই করা যেতে পারে। তাঁর দেয়া হেদায়েতের মানদ-কেই কেবল ছহীহ ও গলদ এর মানদ- রূপে মেনে নেয়া যেতে পারে। আল্লাহর আনুগত্য হতে মুক্ত স্বতন্ত্র ধরনের আনুগত্য, খোদার আইন বিধানের সনদ ছাড়াই অপর কোন আইন বিধান মেনে নেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ না করা ও স্বীকৃতি না দেওয়াই প্রকৃত মুসলমান হওয়ার জন্য মূল শর্ত। এই সব অধিকারের মধ্য থেকে যে অধিকারই আল্লাহ ছাড়া অপর কাকেও দেয়া হবে বা অপর কারো এরূপ অধিকার আছে বলে মনে করলেই তাকে খোদার সাথে শিরক করা হয়। খোদার কোন এক নাম দ্বারা তার নাম করণ করা না হলেও পরিণাম উহাই হবে।”
বর্তমান যুগে মুসলিম জাতি আল্লাহকে অকর্মণ্য বানিয়ে তাঁর পাশাপাশি এ সব ধরনের শিরক করে চলছে। কেননা একই মানুষ মসজিদে নিয়ে আল্লাহর সামনে সেজদাবনত হয়ে ঘোষণা দিচ্ছে, “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা”, দাঁড়ানো অবস্থায় বলছে, “ইয়াকা না’বুদু”- আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করছি, “ওয়ানাতরুকু মাইঁ ইয়াফজুুুরুকা”- তোমার হুকুম অমান্যকারীদের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করছি-তারাই মসজিদ থেকে বের হয়ে খোদার কানুন যারা বদলিয়ে দিতে চায় তাদের সাথে ওঠা বসা করছে, তাদের খোদাদ্রোহী কাজে সহায়তা করে যাচ্ছে। কিছু মুসলমানতো খোদার আইনকে অচল ঘোষণা দিয়ে নিজের গড়া আইনকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আমরা মুসলমান এদের কোন বিরোধিতা না করে বরং সহায়তা করে যাচ্ছি। সুতরাং এ কাজগুলো যদি আল্লাহর সাথে শিরক না হয় তবে শিরক হবে আর কোন কাজ।
প্রাকৃতিক জগতের জন্য যে আল্লাহ সুন্দর আইন বিধান তৈরী করেছেন তিনিই বান্দাহর নৈতিক, দৈহিক, সমাজ-সাংস্কৃতিক ইত্যাদি সব বিষয়ের প্রয়োজন অনুসারে যাবতীয় আইনের মূল সূত্র সমূহ পাঠিয়েছেন রসুলের মাধ্যমে। এখন যদি কেউ মনে করে যে এই সব বিধান তৈরী করার অধিকার আর কারও রয়েছে, যা আমাদের মেনে নেওয়া উচিত, তাহলে তাদেরকে আল্লাহর মোকাবিলায় রব মেনে নিয়ে শিরক করা হবে। এ কাজটাই আজ হরদম মুসলমানরা করে যাচ্ছে নির্দোষ মনে করে। অথচ এ কাজটি যে মানবতার জন্য কত বড় ক্ষতিকর তা আমরা মোটেই বিবেচনা করি না। আর আমরা এ ভাবেই শিরকের জুলমে নিজেদেরকে নিক্ষেপ করেছি।
গাছ, মাছ, দেব-দেবীকে শরীক মানা মানবতার জন্য যতটা ক্ষতিকর তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর মানুষকে খোদার শরীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, ঐ সব দেখা অদেখা শরীকেরা মানুষের উপর কোন বিধান দিতে সক্ষম নয়, বরং বেচারাদের উপরই মানুষ বিভিন্ন গুণ অর্পণ করে পূজা করে মনের চাহিদা মেটায়। পক্ষান্তরে মানুষ যখন সমাজের ইলাহ হয়ে বসে তখন তারা এমন সব বিধি বিধান মানুষের উপর চাপিয়ে দেয় যে তার ভারে মানবতা আর্তনাদ করতে থাকে।
আজ মুসলমান যে পৃথিবীতে অপমানিত ও নিষ্পেষিত হওয়ার কারণ মানুষ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে খোদার আসনে স্থান দেওয়া। দেশে দেশে মুসলমান রাষ্ট্র প্রধানগণ অমুসলমান রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুন ও শর্তাদি মেনে চলছে যদিও তা খোদার হুকুমের পরিপন্থী। এভাবেই মুসলিম সমাজে শিরক চেপে বসে সমাজে অশান্তির সয়লাব বয়ে দিচ্ছে। যুগে যুগে রসুলদের আগমন ঘটেছিল শিরক মুক্ত সমাজ গড়তে। তাই রসুলের অনুসারী দাবীদার প্রত্যেকটি মানুষকে শিরক মুক্ত সমাজ বিনির্মাণে ঝাঁপিয়ে পড়া একান্ত জরুরি।
শিরক হচ্ছে এমন সব কাজ বা কথা যদ্বারা আল্লাহ তাআ’লার যাত(সত্তা) বা সিফাতের(গুণাবলী) সাথে অন্য কোন মখলুককে শরীক করা হয়। যেমন-
১. গায়েবের জ্ঞানের অধিকারী মনে করে কোন পীর ফকীর বা গণকের কথায় বিশ্বাস করা।
২. কাফেরদের হোলী দেওয়ালী ইত্যাদি পূজাতে আমোদ ফূর্তি দেখে ওগুলো পছন্দ করা।
à§©. আল্লাহ তাআ’লা ছাড়া অন্য কাউকে লাভ-লোকসানের অধিকারী মনে করা।
৪.আল্লাহ তাআ’লা ছাড়া অন্য কারো নিকট নিজের মকসূদ, টাকা-পয়সা, ধন-সম্পত্তি, রূযী -রোযগার ইত্যাদী চাওয়া।
৫. কোন পীর, বুযুর্গ বা অন্য কাউকে সিজদা করা।
৬. কোন দরগায় মানত মানা বা কারো নামে গরু ইত্যাদি কোন জানোয়ার ছেড়ে দেওয়া।
à§­.আল্লাহ তা’আলা এবং নবী করীম (স:)-এর হুকুমের মোকাবিলায় অন্য কারো হুকুমকে বা কোন দেশাচার ও রেওয়াজ কে বা নিজের কোন পুরোনো সংস্কার বা অভ্যাসকে বা বাপ-দাদার কালের কোন প্রথাকে পছন্দ বা অবলম্বন করা।
৮. কোন দরগাহ বা পীর বুযুর্গের ঘরের চতুর্দিকে তওয়াফ করা।
৯. আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত অন্য কারো নামে কোন জীবজন্তু জবেহ করা।
১০. ‘উপরি দৃষ্টি’ বা জ্বীনের আছর ছাড়ানোর উদ্দেশ্যে নযরানা দেওয়া বা কারো দোহাই দেওয়া।
১১. কারো নামে ছেলে মেয়েদের নাক-কান ছিদ্র করা বা আংটি, বালি পরানো।
১২. লক্ষণ ধরা। যেমন, প্রথা আছে যে, হাত চুলকালে হাতে টাকা আসবে, হাঁচি দিলে কার্য সিদ্ধি হবে না, ডান চোখ লাফালে ভাল হবে, বাম চোখ লাফালে বিপদ আসবে ইত্যাদি।
১৩. কোন মাস বা তারিখ বা সংখ্যাকে মনহুস (অলুক্ষণে) মনে করা। যেমন, ১৩ কুলক্ষণ।
১৪. কোন বুযুর্গের নাম ওযিফার মত জপ করা।
১৫. কারো নামের বা মাথার কসম খাওয়া।
১৬. ছবি রাখা, বিশেষত: বুযুর্গের ছবি বরকতের জন্য রাখা বা তার তাযীম করা।              
আল্লাহ আমাদেরকে এসব শিরক থেকে রক্ষা করুন আমীন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ