শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

সংলাপ নিয়ে সংশয়

নতুন একটি নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের জন্য রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল হামিদ সম্প্রতি যে উদ্যোগ নিয়েছেন তার সফলতার ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে এজন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের দিকে আঙুল ওঠানো হয়েছে। গত সোমবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভি বলেছেন, à§§à§® ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলের প্রতিনিধিরা বঙ্গভবনে যাওয়ার আগেই ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি নাকি সালিশ মানবে কিন্তু তাল গাছটি চেয়ে বসবে! জনাব কাদের আরো বলেছেন, বিএনপি সত্যিই যদি ‘তাল গাছটি আমার’ বলে বায়না ধরে বসে তাহলে নাকি রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যাবে। 

মন্তব্যটুকুর উল্লেখ করে জনাব রিজভি বলেছেন, বিএনপির পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো কিছু বলা হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওবায়দুল কাদের যেহেতু উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছেন সেহেতু ধরে নেয়া যায়, ‘তাল গাছটি’ আওয়ামী লীগকে দিয়ে দিলেই সম্ভবত সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে! অন্যদিকে বিএনপি মনে করে, সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে ওবায়দুল কাদের বর্ণিত ‘তাল গাছটি’ সকলের হওয়া দরকার। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির আহ্বানে অনুষ্ঠানরত সংলাপের মধ্য দিয়ে এমন কোনো মীমাংসায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা উচিত যা সকল দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। বেগম খালেদা জিয়া তার à§§à§© দফা প্রস্তাবের মূলকথায় তো বটেই, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকের সময়ও সেটাই বলেছেন। তিনি বলেননি যে, মীমাংসা তথা নতুন নির্বাচন কমিশন শুধু বিএনপির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। তাছাড়া রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপিত বক্তব্যে বা à§§à§© দফা প্রস্তাবের কোথাও বলা হয়নি যে, যাচাই বা সার্চ কমিটির আহ্বায়ক বিএনপির সমর্থক কাউকে বানাতে হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য কমিশনারদের ব্যাপারেও বিএনপি তেমন দাবি জানায়নি। প্রতিটি বিষয়ে বিএনপি বরং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং যোগ্য ব্যক্তিদের নিযুক্তি দেয়ার কথা বলেছে। বিএনপি একই সাথে ঐকমত্য গড়ে তোলার জন্যও আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক হওয়ারও কয়েক ঘণ্টা আগে ওবায়দুল কাদের তাল গাছের প্রসঙ্গ টেনে আনায় এমন আশংকাই শক্তি অর্জন করেছে যে, রাষ্ট্রপতি সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটালেও সরকার এবং দলগতভাবে আওয়ামী লীগ সম্ভবত নিজেদের ইচ্ছাই পূরণ করিয়ে নিতে চায়। নাহলে ‘তাল গাছটি আমার’ বলে ওবায়দুল কাদের ব্যঙ্গ ও রসিকতা কেন করবেন? বিএনপির ওই সংবাদ সম্মেলনে আশা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীনরা তাদের বক্তব্য ও মন্তব্যের ক্ষেত্রে সংযম ও সতর্কতা অবলম্বন করবেন এবং এমন কিছু বলে বসবেন না, যার ফলে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।  

আমরা সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত বিএনপির বক্তব্যকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত মনে করি। কারণ, নির্বাচন কমিশন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা বিতর্কের মধ্যে গত ১৮ নভেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে ১৩ দফা প্রস্তাব হাজির করেছিলেন তার কোথাও এমনকি ইঙ্গিতেও একথা বলা হয়নি যে, সার্চ কমিটির আহ্বায়ক বা সিইসিসহ কোনো নির্বাচন কমিশনারকে বিএনপির সমর্থক বা বিএনপির মনোনীত হতে হবে। খালেদা জিয়া বরং সিইসি সম্পর্কে বলেছিলেন, তাকে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও সকল বিচারে দল-নিরপেক্ষ এবং নৈতিকতা, ব্যক্তিত্ব ও কর্ম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সৎ ব্যক্তি হতে হবে। তিনি এমনকি দেশের যে কোনো একজন বিশিষ্ট নাগরিককেও পদটিতে নিযুক্তি দেয়ার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছেন। সেই সাথে বলেছেন, পদটিতে এমন কাউকে নিযুক্তি দেয়া চলবে না, যিনি অবসরগ্রহণ বা পদত্যাগের পর সরকারের লাভজনক কোনো পদে চুক্তিভিত্তিক নিযুক্তিপ্রাপ্ত ছিলেন বা আছেন। নির্বাচন কমিশনারদের যোগ্যতার ব্যাপারেও একই ধরনের কিছু পূর্বশর্তের কথা তুলে ধরেছেন বেগম খালেদা জিয়া। প্রস্তাবে তিনি সার্চ কমিটি সম্পর্কে বলেছেন, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসমূহ এবং/অথবা স্বাধীনতার পর প্রথম জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে এমন সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন নারীসহ পাঁচ সদস্যের এই কমিটি গঠন করতে হবে। সার্চ কমিটির আহ্বায়ক হবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মক্ষম প্রধান বিচারপতি (জ্যেষ্ঠতা অনুসারে), যিনি বিতর্কিত নন এবং অবসর গ্রহণের পর যিনি সরকারের কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত নন বা ছিলেন না।

এভাবে মূলকথায় স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বিষয়ে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা প্রণয়নের জন্যই দাবি জানিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অনুষ্ঠিত  à¦¬à§ˆà¦ à¦•েও তিনি à§§à§© দফারই পুনরাবৃত্তি করেছেন। তিনি বলেননি যে, বিএনপি বা ২০ দলীয় জোটের কাছে গ্রহণযোগ্য কাউকে সিইসি, নির্বাচন কমিশনার কিংবা সার্চ কমিটির আহ্বায়ক বানাতে হবে। মূলত সে কারণেই রাষ্ট্রপতিও বেগম খালেদা জিয়ার সদিচ্ছার প্রশংসা করে বলেছেন, তিনি গঠনমূলক ও সুন্দর প্রস্তাব রেখেছেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির এই মনোভাবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী অবস্থানে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ‘তাল গাছটি আমার’ কথাটা তুলে আপত্তি ও সংশয়ের সৃষ্টি করেছেন। উল্লেখ্য, বেগম খালেদা জিয়া যেদিন তার à§§à§© দফা প্রস্তাব হাজির করেছিলেন সেদিনই ওবায়দুল কাদের প্রস্তাবগুলোকে ‘অন্তঃসারশূন্য’ আখ্যা দিয়ে নাকচ করে দিয়েছিলেন। তখনও প্রশ্ন উঠেছিল, জনাব কাদের আদৌ à§§à§© দফা পড়ে দেখেছিলেন কি না। কিন্তু উত্তর দেয়ার ধারেকাছে না গিয়ে নতুন পর্যায়ে তিনি সালিশ মানি তবে তাল গাছটি আমার- এই প্রবাদবাক্য শুনিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে নিজেদের সন্তোষের কথা জানানোর পর একই ওবায়দুল কাদের আবার বলেছেন, বিএনপির এই খুশি খুশি ভাব যেন শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে! লক্ষণীয় যে, কথাটার মধ্যে ব্যঙ্গ-তামাশার উদ্দেশ্য গোপন করা হয়নি। 

আমরা মনে করি, এ ধরনের মনোভাব ও বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য মোটেও অনুকূল হতে পারে না। আমরা আশা করতে চাই, রাষ্ট্রপতির উদ্যোগকে সফল করার উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীনরা সংযম ও সতর্কতা অবলম্বন করবেন, যাতে বিভিন্ন দলের সঙ্গে পর্যায়ক্রমিক সংলাপের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনকেন্দ্রিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে। সকল সংকটের মূল কারণ তথা নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারেও রাষ্ট্রপতিকে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। কারণ, এ প্রশ্নে নিষ্পত্তি না হলে স্থায়ীভাবে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। ক্ষমতাসীনরা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করবেন এবং ঝামেলা বাধানোর পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিকে সহযোগিতা করবেন বলেই আমরা আশা করতে চাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ