রবিবার ১৪ জুন ২০২৬
Online Edition

মাতৃভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান

সাদেকুর রহমান : মহান ভাষা আন্দোলনের অম্লান, অজেয় স্মৃতিবাহী মাস ফেব্রুয়ারির ঊনিশতম দিবস আজ রোববার। দিকে দিকে এখন চলছে অমর একুশে উদযাপনের প্রস্তুতি। বনে বনে ফাল্গুনের রং লেগেছে, চলছে রক্তিম উৎসব। বসন্ত যেমন প্রকৃতির নবজাগরণের ‘ঋতু’ ফেব্রুয়ারি তেমনি নতুন দীক্ষা নেয়ার মাস। কোকিলের কুহুতান, পলাশ-শিমুলের রক্তলাল পুষ্পডালি যেমন পুরনো মনে হয় না, ফেব্রুয়ারির আবেদনও তেমনি কখনো ফুরিয়ে যায় না। তাই তো ভাষার মাসটি এলেই জেগে ওঠে প্রাণ। ফেব্রুয়ারি কেবল রোমান দেবতা ‘ফেব্রুস’-এর নামানুসারে রাখা ইংরেজি বছরের একটি মাত্র মাস নয়, গোটা দুনিয়ার তাবৎ মানুষের মধ্যে ভাষাপ্রেমের বীজমন্ত্র গ্রত্থিত হওয়ার সুবর্ণকালও বটে।
“যেসবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি”Ñ à¦®à¦§à§à¦¯à¦¯à§à¦—à§‡à¦° কবি আব্দুল হাকিমের কাব্যগাথা মাতৃভাষাবিরোধী জন্ম নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি করে। যদিও সেই হাজার বছরের চর্যাপদ, মনসামঙ্গল, গীতগোবিন্দ, মৈমনসিংহ গীতিকা, পুঁথি সাহিত্য, গজল, বাউল গান, আলাওল, চন্ডীদাস, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ এবং সমকালীন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদের প্রবহমান এবং শাশ্বত ঐতিহ্যের ধারায় আমরা অবগাহন করেছি বংশানুক্রমে। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা ষোলআনা বাংলাভাষী সাজার চেষ্টা করি। এ কথা সত্য যে, ভাষা আন্দোলন তথা একুশের চেতনায় অনেকেই চলনে-বলনে বাংলাভাষী হতে সক্ষমতা অর্জন করেছে। একই কারণে মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগেও মোবাইল টেলিকম অপারেটররা বাংলা ভাষায় রিংটন, এসএমএস, স্ক্রিন ডিসপ্লে চালু করেছে। বিগত ২০০৬ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) à§® জন এবং সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ২ জন ছাত্রের উদ্ভাবিত সফটওয়্যারের কল্যাণে রবি’র গ্রাহকরা সর্বথম বাংলায় ক্ষুদে বার্তা করার সুযোগ লাভ করে। এখন তো নকিয়াসহ বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের মোবাইল সেটেও বাংলা সফটওয়্যার সংযোজিত হয়েছে। এসব সফটওয়্যার উদ্ভাবনকারীরা যথার্থ মূল্যবোধক গুরুত্ব দিয়ে কেবল বাংলা ভাষাকেই উচ্চকিত করেননি, নিজেরাও কীর্তিমান হয়ে থাকবেন।
বিগত ক’বছরের মতো মাতৃৃভাষা বাংলা নিয়ে এবারও সরব আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। গণমাধ্যমগুলোর বাংলা বানানের হেনস্তাসহ ভাষার দুঃখগাঁথা নিয়ে অনেক বিশেষ প্রবন্ধ-নিবন্ধ, টক-শো ইতোমধ্যেই প্রকাশিত, প্রচারিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটও ইতিমধ্যে ভাষা সমীক্ষা শুরু করেছে। সঙ্গত কারণেই একটি প্রশ্ন জাগে, ভাষা শহীদ দিবসটি একুশে ফেব্রুয়ারি না হয়ে à§® ফাল্গুনে পালন করা হয় না কেন? এর পাল্টা প্রশ্নও হতে পারে, ‘একুশে’ না হলে দিনটি সার্বজনীনতা পেতো? অমর একুশে এখন আন্তর্জাতিক-এটা কি কম অর্জন? এ বছরও জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা à¦¹à¦¬à§‡Ñ à¦à¦Ÿà¦¾ বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষাকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছে!
এদিকে, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে ১৯৭৬ সালে ‘একুশে পদক’র প্রচলন করা হয়। এটি বাংলাদেশের একটি জাতীয় এবং সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার। দেশের বিশিষ্ট ভাষাসৈনিক, ভাষাবিদ, সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, দারিদ্র্য বিমোচনে অবদানকারী, সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় পর্যায়ে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদক প্রদান করা হচ্ছে। একুশে পদকে à§§ লাখ টাকা, à§§à§® ক্যারট স্বর্ণের মেডেল এবং একটি সনদ প্রদান করা হয়। পদকটির ডিজাইন করেছেন পরলোকগত শিল্পী নিতুন কুন্ডু। প্রত্যেক পদকপ্রাপ্তকে একটি স্বর্ণপদক, সম্মাননা সনদ এবং পুরস্কারের অর্থমূল্য প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রাথমিকভাবে পুরস্কারের অর্থমূল্য ২৫ হাজার  টাকা দেয়া হতো এবং বর্তমানে এটি à§§ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এ বছর ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদান রাখায় ড. শরীফা খাতুন সহ à§§à§­ জন বিশিষ্ট নাগরিককে ‘একুশে পদকে’ ভূষিত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তাদের নামও ঘোষণা করা হয়েছে। আগামীকাল সোমবার ২০ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের হাতে পদক ও ক্রেস্ট তুলে দেয়ার কথা রয়েছে।
এছাড়া ভাষা শহীদদের প্রতিচিত্র সম্বলিত ‘ মোদের গরব বা আমাদের গর্ব’ হল বাংলাদেশের রাজধানীর বাংলা একাডেমি ভবনের সামনে অবস্থিত একটি ভাস্কর্য। এতে ভাষা শহীদ আবদুস সালাম, রফিকউদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার, শফিউর রহমান, এবং আবুল বরকতের ধাতব প্রতিচিত্র রয়েছে। এগুলো মূল ভিত্তিটির উপর রয়েছে এবং এর পেছনে একটি উঁচু দেয়াল রয়েছে। এই দেয়ালটির উভয় পাশে টেরাকোটা নকশা করা আছে। এখানে ভাষা আন্দোলনের ঘটনার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
অন্যদিকে,‘অমর একুশে ভাস্কর্য’টি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিতর্পণমূলক ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে অন্যতম ভাস্কর্য। এই ভাস্কর্যটি রাজধানীর উপকণ্ঠে সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২নং গেইটের সামনে অবস্থিত। এর স্থপতি শিল্পী জাহানারা পারভীন। ভাস্কর্যটির স্তম্ভসহ ফিগারের মোট উচ্চতা ৩৪ ফুট। এটি নির্মাণ করা হয়েছে চুনাপাথর, সিমেন্ট, ব্ল্যাক আইড, বালি, মডেলিং ক্লে প্রভৃতি দিয়ে। ‘অমর একুশে’ মনে করিয়ে দেয় ত্যাগ আর অগণিত প্রাণের বিনিময়ে বাঙালির প্রাপ্তি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ