শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

শহীদের মিছিল যেন থামছেই না

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের জেরে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর নতুন সরকারের সময় এরই মধ্যে দুই মাসেরও বেশি অতিবাহিত হয়েছে। আর জুলাই মাস-অর্থাৎ যে মাস থেকে আন্দোলনটি তুঙ্গে ওঠে, তখন থেকে সময় গণনা করলে তিন মাসেরও বেশি সময় এরই মাঝে চলে গেছে। অথচ এখনো আমাদেরকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভিকটিমদের শাহাদাতের খবর পেতে হচ্ছে- যা সত্যিই বেদনাদায়ক। মানুষের হায়াত বা মৃত্যু আল্লাহর হাতে। যার যখন সময় হবে তিনি এই পার্থিব জগৎ ছেড়ে চলে যাবেন। এটি বাস্তবতা, এটিই নিয়তি। কিন্তু ফ্যাসিবাদী শাসন পরবর্তী এই অনুকূল সময়েও আমরা ভিকটিমদের আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছি, নিঃসন্দেহে তা আমাদের জন্য ব্যর্থতা।

শহীদের তালিকায় সর্বশেষ নাম লেখালেন চট্টগ্রাম বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী কাউসার মাহমুদ। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার আগের দিন ৪ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট চত্বরে পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন। দীর্ঘ ৭০ দিন হাসপাতালের বেডে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পর গত রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) তিনি মারা যান। এর আগে গত সপ্তাহে শহীদ হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেকজন ভিকটিম শহীদ জীবন।

এ ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে যেন দেখিয়ে দেয়, কতটা পাশবিক পন্থায় শেখ হাসিনার শাসন আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের দমন করতে চেয়েছিল। নিজ দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইনশৃংখলা বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে যেভাবে গণহত্যা পরিচালনা করা হয়েছে তা নজিরবিহীন। এ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কলংকজনক অধ্যায়।

এবার আসা যাক আমাদের দায় প্রসঙ্গে। প্রায় তিন মাস পরে এসেও অসংখ্য আহত ভিকটিম এখনো রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে কিনা, তাদেরকে প্রতিশ্রুতি মোতাবেক প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্য প্রদান করা হচ্ছে কিনা- তা নিয়ে অনেক কথাবার্তা শোনা যায়। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই আগস্ট অভ্যুত্থানের ভিকটিমদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ফাউন্ডেশন করে দিয়েছেন। আমরা আশা করি, এই ফাউন্ডেশন স্বচ্ছতার সাথে কাজ করবে এবং সকল ভিকটিমের পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে।

কারণ বেসরকারী পর্যায়ে বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিক না কেন, তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। এ জন্য মূল উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। আরেকটি বিষয় হলো, ভিকটিমদের সহায়তার প্রসঙ্গ আসলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফোকাসটা শহীদ পরিবারগুলোর দিকে চলে যায়। এটি খুবই জরুরি এবং ন্যায্যও বটে। কিন্তু আহতদের দিকেও গুরুত্বের সাথে নজর দেওয়া দরকার। প্রতিটি আহত ভিকটিম প্রচন্ড ব্যাথ্যা ও যন্ত্রনা নিয়ে দিন যাপন করছে। তাই তাদের চিকিৎসা বা শারীরিক অবস্থার উন্নতিতে বিলম্ব হলে কার্যত তাদের কষ্ট আরো অনেক বেড়ে যায়। কেননা, এরই মধ্যে অনেকেরই হাত পা কেটে ফেলতে হয়েছে। অনেকের চোখে গুলি লেগেছে। অনেকের শরীরে এখনো শত শত স্প্রিন্টার। 

এই আহতদের জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রদান করা প্রয়োজন। যদি দেশে সম্ভব না হয়, তাহলে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার আয়োজন করা উচিত। আহতরা চিকিৎসা না পেয়ে অথবা দীর্ঘদিনের চিকিৎসা প্রয়াসকে ব্যর্থ করে দিয়ে মারা যাবেন-একটি সফল অভ্যুত্থানের তিন মাস পর এসে আমরা তা শুনতে চাই না। অন্তবর্তীকালীন সরকারসহ আমাদের সবারই মনে রাখা উচিত, আমরা যেটুকু স্বাধীন ও নিরাপদ অবস্থায় এখন রয়েছি, তা সম্ভব হয়েছে এই ভিকটিম ছাত্রছাত্রীদের আত্মত্যাগের কারণেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ