শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

শহীদের গোসল লাগে না

 

সাইফ আলি

বউমা... মুবাইলডা দেওতো ইট্টু, মনডার মদি ভালো ঠ্যাকছে না, হাসানের সাথে কথা কই।

শাশুড়ির কণ্ঠ শুনে মোবাইল নিয়ে খোলাটের দিকে গেলো রেশমা। 

: এই নেন, সকালবেলা একবার ফোন দিছিলো, হাতের কাছে না থাকায় ধরতি পারিনি। 

তাহেরা ঝাড়ু দিয়ে শেষ করতে পারে না। মনটা ভীষণ অস্থির। খবরে দেখাচ্ছে ঢাকায় নাকি মারামারি চলছে । হাসান থাকে ঢাকায়, তাহেরার বড় ছেলে। ছ’মাস হলো রাজমিস্ত্রীর কাজে গেছে। মামার কাছে শেখা। রাজমিস্ত্রী হিসেবে মামার বিশেষ খ্যাতি আছে। রক্তসূত্রে সেটা হয়তো ওর মধ্যেও প্রবাহিত । অল্পদিনেই ভালো কাজ শিখেছে। মামার সাথে থেকে যা কামাই হতো তাতে সংসার ভালোই চলছিলো কিন্তু আরেকটু সচ্ছলতার চিন্তা শেষমেশ ঘরছাড়া করলো ছেলেটাকে।

হাসানের পর আরও দুটো ছেলে আছে তাহেরার। কলাগাছের মতো বেড়ে উঠলেও বুঝ হতে সময় লাগবে । সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ানোই কাজ। বার বার বলে ছাগল গরুর খাবার দেওয়াটাও হয় না ওদের দিয়ে।  ওদের বাপের চায়ের দোকান। সারাদিন সেখানেই থাকে। জমিজমা খুব বেশি নেই। যা আছে তাও বন্ধক রাখা লাগছে হাসানের মেয়েটা হওয়ার সময়। সিজারের বাচ্চা, মেলা খরচ। তার উপর অসুখ বিসুখ লেগেই আছে। আজকালকার বাচ্চাকাচ্চার কিছুই সহ্য হয় না। রোদ বৃষ্টি কিছুই না। 

জমিগুলোর বন্ধক ছাড়ানোও হাসানের ঢাকা যাওয়ার বরেকটা কারণ। 

ঢাকা বলতে আশুলিয়াতে থাকে হাসান । বহুতল ভবনের কাজ চলছে সেখানে। ওর মতো আরো অনেকেই কাজ করে ভবনটায়। ছ’মাসে অনেককিছু শিখেছে। নতুন নতুন কাজ। এলাকায় ফিরে গেলে এসব অভিজ্ঞতার দাম আছে। ঢাকায় সে থাকতে আসেনি। সবসময় বাড়ির কথা মনে পড়ে। সবুজ মাঠ, সন্তানের মায়া, বউয়ের আদর সব। বাপ-মার কথা মনে পড়ে কিন্তু প্রকাশ করতে পারে না। কেমন যেনো লজ্জা লাগে। 

হাসানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু শামীম। ওদের গ্রামেরই ছেলে। একসাথে বড় হয়েছে। শামীম ঢাকায় এসেছে বছর দুয়েক। ওর মাধ্যমেই হাসানের আসা। একসাথেই থাকে এখন। একসাথেই কাজ করে, খায়। শামীম এখনো বিয়ে করেনি। টাকা পয়সা কিছু গুছিয়ে তারপর বিয়ে করবে। বাড়িতে ওরা কমই যায়। যাওয়া আসার খরচ আছে, আবার বাড়িতে গিয়েই ফিরে আসলে সে যাওয়ার অর্থ কি। 

হাসানের ফোন বেজে ওঠে। মায়ের ফোন। 

: হ্যা মা, বলো...

: কি করছিস বাজান।

: কাম করি, ক্যান...

: খবরে দেখাচ্ছে ওখানে নাকি মারামারি হচ্ছে, তুই কিন্তু রাস্তায় বেরোসনে বাজান, আমার মনডার মদি ভালো ঠেকছে না। 

: আচ্ছা, আব্বার বলেনে আজকে সন্দার দিকি কিছু টাকা পাঠাবানে। এখন রাখলাম, কাজ করছি।

: তে রাখ, সাবধানে থাকিস।

কল কেটে হাসান ঘড়ি দেখে, খাওয়ার সময় হয়ে গেছে।  আজকে সকালে রান্না করা হয়নি। দুপুরের খাবারও তাই আনা হয়নি। হোটেলে গিয়েই খেতে হবে। 

হাসান আর শামীম বের হয়। কিছুদূর এসে বড় রাস্তায় উঠতেই মানুষের দৌড়াদৌড়ি আর চেচামেচি দেখতে পায়। ঘটনা আঁচ করার চেষ্টা করে হাসান। গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসছে। কিছু মানুষ দৌড়ে পালাচ্ছে, আবার কিছু মানুষ ইট পাটকেল হাতে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। 

: কি হয়েছে ভাই? 

: পুলিশ গুলী করছে। 

: ক্যান?

: জানিনে, শুনলাম বিভিন্ন জায়গায় মানুষ মরছে পুলিশের গুলীতে। এতে মানুষ আরও বেশি ক্ষেপে গেছে। মিছিল বের হচ্ছে সব জায়গায়। ভার্সিটির ছেলেদের বুকে গুলী করছে। ওরাতো আমাদেরই ভাই তাইনা? 

একনাগাড়ে এতোগুলা কথা বলে থামলো লোকটা। হাসানের মধ্যে দুশ্চিন্তা দেখা দিলো। ওদিকে যাওয়া কি ঠিক হবে। এসময় একটা মিছিল এলো। উত্তেজিত জনতা শ্লোগান দিচ্ছে। শ্লোগানগুলো হাসানকে টেনে নিলো মিছিলে।  যোগ দিলো শামীমও। শ্লোগানের সাথে টিয়ারশেলের ধোঁয়া, সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ মিশে একাকার। এর মধ্যে কয়েকজন পড়ে গেলো। 

: গুলী করছে রে... গুলী...

হাসানের বিশ্বাস হতে চায় না। সত্যিই গুলী! রক্তে ভেসে যাচ্ছে রাজপথ। হঠাৎ একটা গুলী হাসানের মাথার পেছন দিক দিয়ে ঢুকে গেলো। শামীম কয়েকবার নাম ধরে ডাকলো, হাসান... হাসান... 

তারপর ওকে রেখেই দৌড় দিলো উদভ্রান্তের মতো।  হাসানের ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না সন্ধ্যা থেকে। এর আগে অবশ্য ফোন দেওয়াও হয়নি। রাত বাড়ার সাথে সাথে দুশ্চিন্তাও বাড়তে থাকলো। শামীমের মোবাইল বন্ধ। 

মাঝরাতে একটা মাইক্রো এলো হাসানের বাড়িতে। লাশ নিয়ে। সকালের আগেই দাফন করতে হবে। লোক জড়ো হওয়া যাবে না। যতদ্রুত সম্ভব মাটি দিতে হবে। কবরের নিস্তব্ধতা নেমে এলো যেনো। ছেলে হারানোর শোক পালন করাও নিষিদ্ধ। এ কেমন রাত। স্বামী হারানোর কষ্ট ছাপিয়ে হাসানের স্ত্রীর কণ্ঠ রোধ করলো ভয়। 

ইমাম সাহেব হাসানের বাপের কানে কানে বললেন, ‘শহীদের গোসল দিতে হয় না, জানাযা পড়িয়েই কবর দিয়ে দেন।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ