শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

আবাসন খাতে ধস

নানাবিধ কারণেই দেশের আবাসন খাতে ধস নেমেছে। আর নির্মাণসামগ্রীর অতিমাত্রায় মূল্যবৃদ্ধি এর অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে। ফলে কমছে নতুন প্রকল্প; বিক্রিতেও মন্দাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, গত তিন মাস বিক্রি প্রায় শূন্যের কোঠায়। রিহ্যাব সূত্র বলছে, ২০১০-২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে বিক্রি ছিল ১৫ হাজারের কাছাকাছি ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট। ২০১৩-২০১৬ পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ১২ হাজারের বেশি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়। ২০১৭-২০২০ পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে বিক্রি হয় ১৪ হাজার ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট। ২০২০ সালের জুলাই-২০২২ সালের জুন পর্যন্ত প্রতি বছর বিক্রি হয় ১৫ হাজারের কাছাকাছি।

এরপর ড্যাপ (The Detailed Area Plan) বাস্তবায়ন আর নির্মাণ উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিতে বিক্রি কমতে থাকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০ হাজারের কাছাকাছি বিক্রি হয়। সদ্য বিদায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরও কমে সেটি ১০ হাজারের নিচে নেমেছে। তবে চলতি বছরের শুরু থেকে ড্যাপ বাস্তবায়নের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে ৮০০ ফ্ল্যাট বিক্রি হওয়ার কথা থাকলেও তা শূন্যে নেমেছে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে। শূন্যের কোঠায় নেমেছে বুকিং।

আবাসন ব্যবসায়ী ও ভবন মালিকরা বলছেন, নতুন ড্যাপ বৈষম্যমূলক এবং অস্পষ্ট। এ কারণে নতুন প্রজেক্ট নেই, চলমান প্রজেক্টেও বিক্রি খুবই কম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘ড্যাপের কারণে নতুন প্ল্যান পাস না হওয়ায় বুকিং নেই। আগের বুকিং দেওয়া রেডি ফ্ল্যাট হস্তান্তর ছাড়া বিক্রিও নেই। নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেশি হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্টের ওপরে। এ কারণে চলমান কিংবা রেডি ফ্ল্যাট বিক্রিতে ভাটা পড়েছে।

ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) তৈরি করেছে। গত বছরের আগস্টে যা কার্যকর হয়। ঢাকাসহ আশপাশের এক হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে এ মহাপরিকল্পনা। যেখানে জনঘনত্ব ও অন্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে ভবনের উচ্চতা বেঁধে দেয়া হয়েছে।

আবাসন কোম্পানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন ড্যাপের কারণে প্ল্যান পাস বন্ধ। এটার একটা সমাধান না হলে আমাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হবে। চলমান প্রজেক্টে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে অলস সময় পার করতে হচ্ছে। নির্মাণ উপকরণের দাম বেশি হওয়ায় বিক্রিও এখন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এখন লোকসান গুনতে হচ্ছে বিক্রির আশায়।

লোকেশন, চাহিদা আর কোম্পানিভেদে ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের দাম বেড়েছে প্রতি স্কয়ার ফিটে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব সূত্র জানায়, দু-তিন বছর আগে গুলশান এলাকায় প্রতি স্কয়ার ফিট ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা ছিল। সেটি বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ২৬ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

বনানী এলাকায় বর্তমানে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে রয়েছে, যা বিগত আড়াই থেকে তিন বছর আগেও বিক্রি হয়েছে ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকায়। ধানমন্ডি এলাকায় প্রতি স্কয়ার ফিটে দাম বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ১৭ থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে, যা আড়াই থেকে তিন বছর আগে বিক্রি হয়েছে ১২ থেকে ১৮ হাজার টাকার মধ্যে।

এছাড়া মিরপুর এলাকায় প্রতি স্কয়ার ফিট বিক্রি হচ্ছে ৬ থেকে ৯ হাজার টাকার মধ্যে। এর আগে যেটা বিক্রি হয়েছে ৪ থেকে ৫ হাজার বা ক্ষেত্রবিশেষে সাড়ে পাঁচ হাজারের মধ্যে। বনশ্রী-আফতাবনগর এলাকায় বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা প্রতি স্কয়ার ফিট। আড়াই থেকে তিন বছর আগেও যেটা বিক্রি হয়েছে সাড়ে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকার মধ্যে। উত্তরা (সেক্টর ১-৭) প্রতি স্কয়ার ফিট বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৮ থেকে ১৩ হাজার টাকায়। নতুন উত্তরা এলাকায় ৭ থেকে ৯ হাজার টাকার মধ্যে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডি এলাকায় জমি সংকট। অন্যদিকে বড় গ্রাহক বা ক্রেতার পছন্দের জায়গা এই তিন এলাকায়। এতে এখানে ফ্ল্যাটের দাম অনেক বেশি, আগামীতে কমার সম্ভাবনা কম। অন্য এলাকায়ও দাম বাড়ছে ফ্ল্যাটের। নির্মাণ খরচ বেশি, উপকরণের উচ্চমূল্য আর ড্যাপের কারণে নতুন প্ল্যান পাস না হওয়ায় দাম আগামীতে আরও বাড়তে পারে।

ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের দাম বাড়ার কথা স্বীকার করছেন আবাসন ব্যবসায়ীরাও। তারা জানাচ্ছেন, নির্মাণ উপকরণের দাম কমলে ঘুরে দাঁড়াবে ব্যবসা। নির্মাণ উপকরণের অতিরিক্ত দাম বাড়ার ফলে ছোট ফ্ল্যাটের খরচই এখন ৭৫ লাখ টাকার বেশি পড়ছে। বড় বা মাঝারি ফ্ল্যাটের খরচ আরও বেশি। যদিও নির্মাণের প্রধান উপকরণ রড ও সিমেন্টের দাম কিছুটা কমেছে। বাজারে এখন নির্মাণের প্রধান উপকরণ রড-সিমেন্টের দাম কিছুটা কমেছে। রডের ক্ষেত্রে প্রতি টনে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত কমেছে। আর সিমেন্টে প্রতি ব্যাগে কমেছে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত।

সার্বিক পরিস্থিতিতে চাহিদা বেড়েছে পুরাতন ফ্ল্যাটের। বিশেষ করে মিরপুরের মণিপুর, বাড্ডা, উত্তরখানসহ গ্যাস সংযোগ রয়েছে এবং বিদ্যুতের সমস্যা নেই এমন ফ্ল্যাটের কদর বেড়েছে। দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় এটা বেছে নিচ্ছেন তারা। এমতাবস্থায় দেশের আবাসন খাতকে ছন্দে ফিরিয়ে আনার জন্য নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে নেমে আনা দরকার। আর ড্যাপ নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এতদসংক্রান্ত বিধিমালা হালনাগাদ ও বাস্তবসম্মত করা দরকার। অন্যথায় দেশের আবাসন খাতকে স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ