শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

১০০ দিনের আলোচনা

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিন গত হয়েছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের প্রায় ১৬ বছরের শাসনে বাংলাদেশকে সংকটের জটজালে অবরুদ্ধ করা হয়েছে। মুক্ত বাংলাদেশের মানুষ এখন শুধু স্বাধীনতা নয়, মানবিক মর্যাদা নিয়ে সম্মানের সাথে বাঁচতে চায়। মুক্ত পরিবেশে আকাশচুম্বী আকাক্সক্ষার বিপরীতে সরকারের গতি-প্রকৃতি নিয়ে এখন হচ্ছে আলোচনা-সমালোচনা। এমন বাস্তবতায় সরকারের ১০০ দিন নিয়ে চর্চা হচ্ছে নানা মহল থেকে। তবে সব চর্চার রূপ এক রকম নয়। রাজনীতিকরা কথা বলছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা কথা বলছেন। কথা বলছেন বুদ্ধিজীবী এবং বিশ্লেষকরাও। অবগতি ও দৃষ্টিভঙ্গির তারতম্যের কারণে গত ১০০ দিনের অর্জন প্রসঙ্গে মতপার্থক্যও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ব্যক্তি মানুষ তো যে কেনো সময় সরকারের কাজ সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনা করতেই পারেন, তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑআলোচনাটি কি প্রেক্ষিত-বিচ্ছিন্ন, নাকি প্রেক্ষিত-যুক্ত? প্রেক্ষিত-যুক্ত হলে আলোচনাটি বস্তুনিষ্ঠ হতে পারে।

গত ১০০ দিনে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে ছিল অনেক কাজ। ভেঙে পড়া আইন-আদালত, পুলিশ-প্রশাসনকে কর্মক্ষম করে তোলা ছিল বড় কাজ। অন্যদিকে ছিল বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি মেটানো। ছিল পোশাক শিল্পের অস্থিরতা দূর করা। পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরদের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করাও ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এসবের ভীড়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ছিল ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ধস নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্গঠন। অন্তর্বর্তী সরকার এই খাতকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। পত্র-পত্রিকায় এই খাতের তৎপরতা নিয়ে লেখালেখি হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে ব্যাংক দখল করে লুটপাটের ঘটনা আমরা জানি। এছাড়া ছিল ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আঁতাত করে কিংবা সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা বের করা। বাণিজ্যের ছদ্মবেশে অর্থ পাচার। এছাড়া ছিল ঋণ খেলাপিদের নানা সুবিধা দেওয়া, টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক টিকিয়ে রাখা এবং ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ধস। এগুলো ছিল বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের চিত্র। দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার এই খাতের ধস ঠেকাতে নিয়েছে নানা পদক্ষেপ। যথেচ্ছ অনিয়মের সুযোগ সরকার বন্ধ করেছে। এর ইতিবাচক ফল লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তবে আরও সংকট রয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম ১০০ দিনে দীর্ঘদিনের ডলার সঙ্কটের আপাত সমাধানে সক্ষম হয়েছে। তবে ব্যাংকিং খাতের আস্থার সংকট এখনো দূর করা যায়নি। বেসরকারি ৫-৬টি ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা এখনো চাহিদা মতো টাকা তুলতে পারছেন না। এই ব্যাংকগুলো হাসিনা আমলে সবচেয়ে বেশি লুটপাটের শিকার হয়েছিল। এসব ব্যাংকের আগের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার, তবে তাদের তারল্য সংকট এখনো দূর হয়নি। আগে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে বেশ কিছু ব্যাংককে ধার দিয়ে আসছিল। নতুন সরকার টাকা ছাপিয়ে ধার দেওয়া বন্ধ করেছে। তাদের টাকার যোগান দিতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকখাত সংস্কারে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনিয়মের শিকার ব্যাংকগুলোর সম্পদের প্রকৃত মান বের করবে এই টাস্কফোর্স। এদিকে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ দেশে ফেরত আনা এবং ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও কানাডা থেকে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনি অথবা অর্থ উদ্ধারে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। এসব ইতিবাচক উদ্যোগের পরও পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণরকে একজন অর্থনীতিবিদের চাইতেও ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ হিসেবে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ বর্তমান সময়ে তাকে পাশে থেকে সহায়তা করার মতো তেমন কেউ নেই। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেকেই আগের সরকারের অনিয়মের সুবিধাভোগী ছিলেন। আবার কেউ বা গা বাঁচিয়ে চলতে চান। এমন অবস্থা প্রায় সব ক্ষেত্রেই। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের কাজের গতি কিছুটা মন্থর বৈকি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ