শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

আজ নিশীথে

জোবায়ের রাজু
শীতের সকাল। রোজী আপা খেজুর রসের সিন্নি রেঁধেছে আয়েস করে। বাবা আর আমাকে যখন থালার মধ্যে রসের সিন্নি বেড়ে দিচ্ছিল, তখন রোজী আপার চোখে পানি। বাবা বললেন, কাঁদছিস কেন? খোরশেদকে মনে পড়েছে?’ রোজী আপা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল, ‘না বাবা, ওই বেঈমানের কথা ভেবে কাঁদার মতো অপদার্থ না আমি। যে আমার অনুমতি ছাড়া আরেকটা বিয়ে করে আলাদা হয়েছে, তার জন্য চোখের পানি ফেলব? কখনোই না।’ আমি প্রশ্ন করি, ‘তাহলে কাঁদছিস কেন?’ রোজী আপা বলল, ‘মুন্নাকে মনে পড়েছে। ও খেজুর রস খুব পছন্দ করত।’ রোজী আপার কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলেও বাবা উগ্রকণ্ঠে বললেন, ‘ওই নিমকহারামের কথা একবারও উচ্চারণ করবি না আমার সামনে।’ বাবার কথা শুনে রোজী আপা কাঁদতে কাঁদতে পাশের ঘরে চলে গেল।
মুন্না এই পরিবারের ছোট ছেলে। সে এখন আমাদের সাথে কোন যোগাযোগ রাখে না। বিয়ে করে আলাদা হয়েছে। ছাত্রজীবনে সে তামান্নার প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। কোর্ট ম্যারেজ করে গোপনে। বাবা প্রথমে নারাজ থাকলেও পরে মেনে নেন মুন্নার বিয়ে। সুখে কাটছিল প্রতিটি দিন। হঠাৎ করে একদিন তামান্না বাপের বাড়ি চলে যায়। ফোনে রোজী আপাকে জানায় সে আর আমাদের সঙ্গে থাকবে না। আমাদের নিম্নমধ্যবিত্ত জীবন তার কাছে দুর্বিষহ। ডাল-ভাত তার পেটে হজম হয় না। আমি আর রোজী আপা এসব ঘটনা জেনে চুপিচুপি কাঁদলেও বাবা আন্দোলিত হয়ে ওঠেন। মুন্না এসবে নাক গলায় না। তামান্নাকে বিয়ের পর সেও আমাদের সাথে এক ধরনের দূরত্ব রেখে চলে। তামান্নাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তার কোনো মাথাব্যথা নেই, বরং শ্বশুরবাড়িতে যাতায়াত দিন দিন বাড়তে থাকে। মনের ভেতর রাগ চাপিয়ে রাখা বাবা একদিন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে বললেন, ‘যে মেয়ে আমাদের ছোট করে কথা বলে, তাদের বাড়িতে যেতে লজ্জা লাগে না? ওখানে আর গেলে এই বাড়ির দরজা তোর জন্য বন্ধ।’ আমি আর রোজী আপা ধরে নিয়েছি বাবার এমন অনুশাসনে মুন্না নত হয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইবে। কিন্তু তা না করে সে ব্যাগে কাপড় গুছিয়ে সোজা বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। রোজী আপা পথ আগলে দাঁড়িয়ে বাধা দিতেই মুন্না বাঘের হুংকার ছেড়ে বলল, ‘সামনে থেকে সরে যা আপা। তোরা দিন দিন অপদার্থ হয়ে যাচ্ছিস।’ রোজী আপা হা করে মুন্নার দিকে তাকিয়ে থাকে।
মুন্না সেদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেল। এই ঘটনার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। মুন্না এতটা বউভক্ত হবে বুঝতে পারিনি। বাবা স্মরণ করতে থাকেন তিনি এই ছোট ছেলের জন্য কখন কি কি করেছেন। ছোটবেলা থেকে মুন্নার কোনো আবদার তিনি অপূর্ণ রাখেননি। যখন যা চেয়েছে, দুহাত ভরে দিয়েছেন। সেই ছেলে কিনা এই সংসারের সবাইকে অপদার্থ ঘোষণা করে চলে গেল।
এভাবে দিন যেতে থাকে। মুন্না আমাদের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখার আর ইচ্ছা পোষণ করেনি।
২.
আজ বহুদিন পর মুন্না এসেছে। বাবা মুন্নাকে দেখে শিশুর মতো দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন। আমি আর রোজী আপা পাশে গিয়ে দাঁড়াই। মুন্না আমাকে বলল, ‘বড়দা, এই শীতে তোমার শ্বাসকষ্টের প্রবলেম হচ্ছে? ইনহেলার নাও তো?’ আমি হেসে বলি, ‘না না, এখন আর শ্বাসকষ্ট হয় না। ভালো আছি। তুই ভালো আছিস মুন্না?’ রোজী আপা মুন্নাকে কি যেন বলতে চাইছে। এমন সময় মুন্না বাবাকে বলল, ‘আব্বা, আজ রাতে আমার ফ্লাইট। আমার শ্বশুর আমাকে কাতার পাঠাচ্ছেন। আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে এসেছি।’
মুন্নার কথা শুনে আমরা সবাই স্তব্ধ। মুন্না বিদেশ যাবে, অথচ আমরা জানি না! আজ বিদায়ের দিন এসেছে আমাদের জানাতে! বাবা রেগে বললেন, ‘অমানুষ। আমরা এখন পর, তাই না? বিদেশে যাবি, অথচ আমরা জানি না। আজ জানাতে এসেছিস? তোর মুখ দেখতে চাই না। সরে যাও এখান থেকে, বেঈমান কোথাকার।’
মুন্না চলে গেল। বাবা বাড়ি কাঁপিয়ে কাঁদলেন। রোজী আপা পাথরের মতো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। আমি মনে মনে বলি, ‘মুন্না, তোর সবসময়ই মঙ্গল হোক।’
শীতের রাত বাড়তে থাকে। সারা ঘর অন্ধকার। উত্তরের জানালাটা খোলা। খোলা জানালা দিয়ে শীতের বাতাস এসে ঘর জমিয়ে দিচ্ছে। রোজী আপা মনে হয় আজ ভুল করে জানালা বন্ধ করতে ভুলে গেছে। কাঁথা সরিয়ে উঠে এসে লাইট জ্বালাতেই দেখি বাবা খোলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমার উপস্থিতিতে বাবা পাশে ডাকলেন।
- এত রাতে জানালা খুলে আছেন কেন আব্বা?
- ইয়ে মানে...
- কোনো সমস্যা আব্বা?
- দেখছি আকাশে কোনো বিমান যাচ্ছে কিনা!
- বিমান?
- হ্যাঁ। আজ রাতে মুন্নার ফ্লাইট। ঠিকমত বিমানে উঠতে পারলো কিনা! ছোটবেলায় বিমানের শব্দ শুনে মুন্না খুব ভয় পেত। আমার সে সব কথা মনে পড়ছেরে।
- আব্বা, আপনি কি বলছেন এইগুলি?
- হ্যাঁরে বেলাল। এতক্ষণ ধরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। কোনো বিমান যাচ্ছে না। মুন্নার জন্য চিন্তা হচ্ছে। ও ঠিকমত বিমানবন্দরে পৌঁছাতে পারলো কিনা?
আমি জানালা বন্ধ করে বাবাকে টেনে বিছানায় নিয়ে আসি। শিশুর মতো কাঁদতে থাকেন বাবা। সে দৃশ্য আমার ভেতরটা তোলপাড় করে দিচ্ছে। বিদায় নিতে এসে যে মুন্নাকে বাবা অপবাদ দিয়ে তাড়িয়ে দিলেন, রাতে সেই মুন্নার ফ্লাইটে বাবা এত উদ্বিগ্ন! আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে। লাইট বন্ধ করে দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে ভাবি, বাবাদের হৃদয় এত কোমল হয় কেন! বাবা বললেন, ‘আমার এত শীত লাগছে কেন বেলাল?’ আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরি। পাশের ঘরে রোজী আপার মোবাইলটাতে কার যেন কল এল। রিংটোনের শব্দে সারা ঘর মেতে উঠছে। বাবা বললেন, ‘কে ফোন করেছে রোজী? মুন্না?’ বাবা অঝোরে কাঁদছেন। আমাদের এই অভাবের ঘরে এক নীরব শোক নেমে এল শীতের এমন মাঝরাত্তিরে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ