শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

দেশ ভালো নেই

সাকির ইফাজ
তখন সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় পা রেখেছি; নতুন নতুন এসেছি ঢাকা শহরে। গোটা অ্যাডমিশন জার্নির বেলা-অবেলা কিংবা কালবেলার শত দুঃখ-বেদনাকে সরিয়ে একদিন পথে নামলাম। জাদুর শহরের কত কত গল্প আমাদের মফস্বল শহরের আটপৌরে বাস্তবতার দেয়ালে দেয়ালে ছড়ানো, তাই যেন স্বচক্ষে দেখবার লোভ সামলাতে না পেরে এক বিকেলে মেট্রো দেখতে বেরোলাম।
জীবনে সেদিন প্রথমবার মেট্রো ভ্রমণ। স্টেশন থেকেই দেখছি অবিরত জনতার মধ্যে হাজার জোনাকির আলোর মতো জ্বলা দুটি চোখ! আমি বিস্মিত,  হতভম্ব!!  স্বয়ং দেবী আফ্রিদি আমাদের মর্ত্যলোকে কেনো? হুমায়ূন আহমেদের কোনো  এক বইয়ে পড়েছিলাম যে, এ পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর চোখ নিয়ে দুটি মাত্র পুরুষ এসেছিলেন। একজন বুদ্ধদেব পুত্র কুনাল আর একজন ইংরেজ কবি পার্সি বিসি শেলী।
আমার মনে হল, তার চোখ ওনাদের দুজনের চেয়েও শত কোটি গুণ সুন্দর! কেবলই কী সুন্দর? প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস ছিল কিনা জানিনা, তবে আমার যা সর্বনাশ হবার তা ততক্ষণে হয়ে গেছে।
তখন সব পাখি নীরে ফিরেছিল কিনা তা ও আমার জানা নেই, তবে পাখির নীরের মতো সে চোখ আমাকে যেন ফেলে দিল বিম্বিসার অশোকের কোন এক ধূসর জগতে কিংবা কোন প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারে! কাঁপাকাঁপা পায়ে আমি যখন মেট্রোতে উঠলাম,  সে ও উঠলো আমারই সাথে। সে আমার পাশে, আমি তার পাশে।
জানিনা, আমাদের দুপাশে কি ছিল! বোধহয় দুই মহাদেশের নীরবতা ছিল! আচমকা ট্রেন চলতে শুরু করলো; কক্ষপথ ঘুরতে ঘুরতে মঙ্গল যেমন কখনো কখনো পৃথিবীর খুব কাছে চলে আসে, ঠিক তেমনি গতিজড়তা হঠাৎ তাকে ঠেলে দিল আমার কোলে। আমার ভেতরটা বজ্রবিদ্যুতের মত চমকে উঠল। এক পৃথিবীর সব বজ্রবিদ্যুৎ এখন আমার শরীরে! কাঁপাকাঁপা গলায় স্যরি শুনবার সুযোগ পেয়ে তারপর কিছুক্ষণ আমাদের মধ্যে যে গল্প চলল সে অপূর্ব কথোপকথন কিংবা ওই কুড়ি মিনিটের যাত্রার পরবর্তী শব্দহীন পৃথিবীর গল্প যদি আপনাদের শোনাতে পারতাম; মানিকবাবুর মতো আজ তাহলে বলতাম যে সেই অপূর্ব কথন সাহিত্যে না হোক,  তা আমার কাছে হয়তো সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠতো। জীবনানন্দের ভাষায়; ‘মনে হয় শুধু আমি আর শুধু তুমি/ আর ওই আকাশের পউষ নীরবতা; রাত্রির নির্জন যাত্রী তারকার কানে কানে কতকাল/ কহিয়াছি আধো আধো কথা!’
ট্রেন থামলো, যাত্রা থামলো তোমার আমার!
জানি আর তার সাথে দেখা হবে না কখনোই; তবুও আমরা স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন বুনি! আমাদের স্বপ্নগুলো স্বপ্নই থেকে যায়।
আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি; আমি তারায় তারায় রটিয়ে তাকে বলে দেবো, আমার শহর ভালো নেই, অবনী!!
উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ।
মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়ার পর মহাকাশে স্যাটেলাইট গেছে; ১৮তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হয়েছে বাংলাদেশ আর পৃথিবীর সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের তালিকায় ও আমরা আছি শুরুর দিকে! একদিকে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের আগ্রাসী তৎপরতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে মানব অস্তিত্বকে; নৈরাজ্য-নৈরাশ্য-অনিশ্চয়তা-ক্লেদ-শঙ্কা আর মনস্তাপে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে আত্মপ্রতারণার। অন্যদিকে দেশের মুদ্রাস্ফীতি সীমাহীন, রিজার্ভের তীব্র সংকট, দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া অথচ দরজায় কড়া নাড়ছে রোজা;
নতুন শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী অভিভাবক সকলে, ব্যাংকগুলোয় তারল্য সংকট প্রখর, ডলার খুঁজে পাওয়া যায় না বাজারে। এখানে কাঁচা মরিচ কিংবা সবজির বাজারে হাত দিতে গেলে রাশা-ইউক্রেন যুদ্ধের ওজর শুনতে হয়।
তবুও আমাদের মুখে হাসি। কোথাও কোনো প্রতিবাদ নেই। কোথাও কোনো আলোড়ন নেই। কিন্তু তা-ই কী হবার কথা ছিল? নাকি কথা ছিল, জুলুমের দিনগুলোতে আমরা তীব্র ক্ষোভে ও রাগে ফেটে পড়বো। কথা ছিল রাজনীতি আমাদের হবে, কথা ছিল; আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন! হয়েছে কী? হয়নি।
কেউ কথা রাখেনি, কেউ কথা রাখে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ