শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

রাফিনের চোখে লাল বাস

ইমতিয়াজ সিয়াম

ঝাপসা ঝাপসা চোখে à§© তলার জানালা দিয়ে একটা লাল রঙের বাস দেখল রাফিন। মনে হলো সেই বাসটা। বুকের মধ্যে ধক করে উঠল রাফিনের। কেমন যেন অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে তার । কেমন যেন কষ্টকর এক অনুভূতি। এমন এক অনুভূতি যা সহ্য করা কঠিন । মনে হয় এই মুহূর্তেই মরে যাবে রাফিন । আর বেঁচে থাকতে পারছে না সে । তবে, কেন সে কষ্ট পাবে? তার তো কষ্ট পাওয়া উচিত না।বাম চোখটা পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে রাফিনের। ডান চোখটা দিয়েও ভালোমতো দেখা যায় না। দূরের জিনিস বোঝা যায় না। মানুষের মুখও মাঝে মাঝে অস্পষ্ট দেখা যায় কাছে থাকলেও। 

মাকে রাফিন বাসটার কথা জিজ্ঞেস করলো। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তার মা বাসটা দেখলো। মা মুখ ঢেকে তার রুম থেকে চলে গেলো। রাফিনের মনে হলো তার মা কাদঁছে অন্য রুমে গিয়ে । সেই ঘটনার পর এমন কোনো দিন যায়নি যে রাফিনের মা কাঁদেনি।  একসময় অনেক স্বপ্ন ছিল রাফিনের। ইচ্ছা ছিল বড় হলে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়াবে। আসলে ছোটবেলা থেকেই ঘরবন্দী ছিল রাফিন। বাইরে বাবা মা খুব একটা যেতে দিত না। বাবা সবসময় বলতো আগে ভার্সিটি যাও তারপরে ঘুরে বেরিয়ো । কখনও বন্ধুদের সাথে একটা পিকনিকে যাওয়া হয়নি রাফিনের। 

খুব মাথাব্যথা শুরু হয়েছে রাফিনের। এখনই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে। এ ব্যথা প্রায় অসহনীয় । 

কলেজে ওঠার পরপরই রাফিনের মাথায় ঢুকে যায় ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষায় ফার্স্ট হতে হবে। যদিও তার বাবা চেয়েছিল ডাক্তারি পড়াতে । কিন্তু, রাফিন জেদ ধরে ছিল ঢাবিতেই পড়বে। ফার্স্ট ইয়ার শেষেই ফুল সিলেবাস কমপ্লিট তার। কার্জন এর পুরানো কিন্তু রোমাঞ্চকর বিল্ডিং-এর ক্লাস করার স্বপ্নে বিভোর ছিল সে ।

মোটিভেশন-এর জন্য ঢাবির লাল বাসের একটা বড় ছবি পড়ার টেবিলের সামনের দেয়ালে আটকিয়ে রেখেছিল রাফিন। সেই থেকে গায়ে  “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়” লেখা লাল বাসের জন্য খুব মায়া- ভালোবাসা কাজ করে রাফিনের। শুধু লাল বাস না ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের লোগো হঠাৎ চোখে পড়লে লোগোটাকে খুব আপন মনে হতো। সে শুধু দিনগুলো চলে যাওয়ার অপেক্ষা করত। আর পড়াশুনার মাঝে একটু ফাঁক পেলেই মায়ের মোবাইলটা নিয়ে ঢাবির ক্যাম্পাসটা দেখতো। খুব স্বপ্ন ছিল তার ঢাবির শিক্ষার্থী হিসেবে ঢাবির লাল বাসে উঠবে।

কোটা আন্দোলন-এর শুরু থেকেই খুব সাবধানে ছিল রাফিন । এগুলো ঝামেলা তার ভালো লাগে না। সে এমনিতেও ভীতু প্রকৃতির। আন্দোলনের শুরু থেকেই কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ যখন গুলি চালাচ্ছিল, রাফিন আর ঘরে থাকতে পারে নাই । ১৮ জুলাই এর পর মায়ের আদেশ ফেলে চলে যায় আন্দোলনে। আন্দোলনে ৩ টা রাবার বুলেট চোখে লাগে রাফিনের। বা চোখে ২ টা । একটা চোখ ভেদ করে মগজে চলে যায়। সেই বুলেট এখনও বের করা সম্ভব হয়নি । ডান চোখেও গুলি ১ টা লাগে ।

ঘুম থেকে উঠলো রাফিন। মাঝে মাঝে তার এই জীবনটা স্বপ্ন মনে হয়। মনে হয় এগুলো কিছুই হয়নি। সব ঠিক আছে । সে হয়তো পরিষ্কার সব দেখতে পারবে । বাইরে গিয়ে বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলতে পারবে । হয়তো এখন সে কোনো স্বপ্নের মধ্যে আছে। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় কলেজ জীবনের শুরুর দিকে ফার্স্ট উইকলি পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে সুন্দর একটা ডায়েরি পাওয়ার ঘটনা, বন্ধুর হঠাৎ জন্মদিনে কেক মাখানো, বিকাল বেলা সাইকেলে ঘুরে বেড়ানো, শীতের দিনে ভলিবল খেলা, আরও কত আনন্দময় স্মৃতি। ওগুলো কি আসলেই রাফিনের জীবনে ছিল ! ভাবতেই তার অবাক লাগে। এখন তার দিনগুলো কাটে একা একা বাসায় বসে। এই জীবন তার যেনো কাটতেই চায় না। ডাক্তার বলেছে, ডান চোখটা ঠিক হওয়ার সম্ভবনা নেই । বাম চোখটা তো আগেই নষ্ট হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাবে রাফিন। বেশিরভাগ সময়ই জানালার পাশে বসে থাকে সে । সুন্দর এই পৃথিবীটা মন ভরে দেখে নিক সে । মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়, খুব খারাপ লাগে রাফিনের। ঢাবিতে পড়ার পুরানো সেই স্বপ্ন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বই নিয়ে পড়াশুনা করতে খুব ইচ্ছা করে। একটা চাপা আর্তনাদ তার মধ্যে কাজ করে। তবে পরক্ষণেই মনে হয়, তার জীবনটা সার্থক অন্তত দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছে। কাঁদতে এখন লজ্জা লাগে রাফিনের। বীর যোদ্ধাদের আর যাইহোক চোখের পানি মানায় না। তবুও মাঝে মাঝে ঢাবির লাল বাসে কখনও আর উঠতে পারবে না, এই ভেবে মনের অজান্তেই চোখে পানি চলে আসে রাফিনের। যদিও, লাল বাসটায় চড়ে বেড়াবার থেকে অনেক অনেক বড় কিছু অর্জন করেছে সে ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ